মানব সভ্যতার ইতিহাসের চমকপ্রদ গুহা (পর্ব-১)

জানা অজানা April 21, 2016 1,592
মানব সভ্যতার ইতিহাসের চমকপ্রদ গুহা (পর্ব-১)

গুহা- মানুষের আদিম আবাসস্থল। গুহা থেকে কুঁজো মানুষ পিঠ সোজা করে উঠে এসেছে আজকের শহরের দালানে। ইতিহাসটা কম লম্বা নয়। গুহাকে আমরা দেখি ফিকশনে, উপন্যাসে, রহস্যের বর্ননায়। আলী বাবা এক যাদুকরী গুহাতেই খুঁজে পেয়েছিল তাঁর রত্ন ভান্ডার। আবার হ্যারি পটারের জীবন হুমকীর মুখে পড়েছিল এক ক্রিস্টাল গুহাতে। বাস্তব জীবনে গুহা সভ্যতার অংশ, বিকাশের অংশ। মানুষের পদচারণায় প্রকৃতির অংশ গুহাগুলো রূপ বদলে হয়েছে তথ্যের ভান্ডার। তার গায়ে অঙ্কিত হয়েছে পৃথিবীর প্রথম লেখনী।


★ আসুন জেনে নিই, বিস্ময়ের ঝুড়ি এইসব গুহাদের কথা....


অজন্তা এবং ইলোরা গুহা, ইন্ডিয়া

ইন্ডিয়ার অজন্তা এবং ইলোরা গুহা খুবই বিখ্যাত। এটি মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। এশিয়ার গুহাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। খৃষ্টপূর্ব ২য় শতক থেকে অজন্তায় মানুষের অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানে ৩০ টি বৌদ্ধ মূর্তি আছে যা পাথরে খোদাই করা। ভারতীয় চিত্রকর্ম এবং স্থাপত্যের সুচারু নিদর্শনের দেখা মেলে এই গুহায়।


ইলোরার ৩৪ টি মূর্তি তৈরি করেছে পাথরে খোদাই করা মন্দির, বিহার এবং মঠ। এখানে উপাসনা করত একাধারে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীরা। এই ধর্মীয় সম্প্রীতি দেখা যায় ৫ম থেকে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত। এখানকার দেয়ালচিত্র, চিত্রকর্ম এবং স্থাপত্যের সূক্ষতা সে সময়ের শিল্পীদের অনন্য দক্ষতা তুলে ধরে।


ফ্রায়া নাখোন গুহা, থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ডের খাও সাম রয় ইয়োট ন্যাশনাল পার্কে এই অসাধারণ চমৎকার গুহার অবস্থান। চুনাপাথরের পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এই গুহা। গুহার ছাদ ধ্বসে প্রকৃতিগতভাবেই ফাকা অংশ তৈরি হয়েছে যার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে পুরো গুহাকে আলোকিত করে দেয়। রাজারা এখানে প্রায়ই বেড়াতে যান এর অভূতপূর্ব সৌন্দর্য্যের স্বাদ নিতে। গুহাটিতে তাই যোগ হয়েছে রয়েল ভ্যালু। গুহার ভেতরে কুহা কারুহাস প্যাভিলিয়ন নির্মিত হয় ১৮৯০ সালে রাজা চুলালংকর্ণ গুহা দর্শনে আসবেন বলে। এরপর অনেক রাজাই এটি দেখতে এসেছেন আর গুহার দেয়ালে রেখে গেছেন তাদের স্বাক্ষর। গুহার ভেতরের বাতাসেই যেন ভেসে বেড়ায় আভিজাত্য আর ঐতিহ্য।


সাংগেশখান গুহা, ইরান

সাংগেশখান অথবা সাং শেখানন গুহাটি অবস্থিত ইরানের জাহরোম শহরের দক্ষিণে, আলবোর্জ পর্বতের কাছে। স্টোন কাটার দিয়ে পর্বতের মাঝে গুহাটি খনন করা হয়েছে। কিন্তু তারা গুহাটি কাটতে গিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য্য নষ্ট করে নি। প্রাচীন মানুষের নান্দনিকতার পরিচয় পাওয়া যায় এখানে। পাথর এবং শিলা বিক্রীর উদ্দেশ্যে এমন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। নিজেদের অজ্ঞাতেই এই অঞ্চলের মানুষেরা তৈরি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মনুষ্য নির্মিত গুহা। প্রচীন ইরানের নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে অনন্য এবং অসাধারণ।


শাহ আল্লাহ দিত্তা গুহা, পাকিস্তান

ইসলামাবাদের দক্ষিণ-পশ্চিমে মারগালা পর্বতের পাদদেশে অবস্থান এই গুহার। শাহ আল্লাহ দিত্তা গ্রামে অবস্থিত শতাব্দীর প্রচীন বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ এটি। শাহ আল্লাহ দিত্তার মাজার এবং কবর রয়েছে ঠিক পাশেই। অষ্টম শতকের এই গুহার দেয়ালে দেয়ালে আছে বৌদ্ধের প্রতিকৃতি। এগুলো ২৪০০ বছরেরও বেশী পুরাতন। গুহাটির প্লার্টফর্মের মত গঠন দেখে বোঝা যায় এটি এক সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধ্যানের জন্য ব্যবহৃত হত। আর পরবর্তীতে ব্যবহার করত হিন্দু সাধুরা। এই গুহার ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। আধুনিক ইসলামাবাদের ঐতিহ্যের স্মারক এটি।


শাপুর গুহা, ইরান

দক্ষিণ ইরানের জাগ্রোস পর্বতে, বিশাপুর শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে এই গুহার অবস্থান। গুহাটির ৫টি সোপান জুড়ে স্থান পেয়েছে রাজা প্রথম শাপুরের (২৪০-২৭২ অব্ধ) প্রকান্ড মূর্তি। তিনি ছিলেন সাসানিদ সাম্রাজ্যের ২য় শাসক। ৭ মিটার উঁচু স্থাপত্যটি তৈরি করা হয়েছে একটিমাত্র বিরাট স্টালাগমাইটকে খোদাই করে। এটি সগর্বে দাঁড়িয়ে ছিল ১৪০০ বছর আগ পর্যন্ত। আরবরা ইরান দখলের পর ভেঙ্গে ফেলে অনন্য এই স্থাপত্যটি। ১৪০০ বছর যাবত এটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল। ১৯৫৭ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পহলবী তাঁর সেনাদের দিয়ে মূর্তিটি মেরামত করেন এবং দাঁড় করান। ৬ মাসে মূর্তিটি আবার প্রাচীন রূপ ফিরে পায়। এটি গুহাটির গর্ব হয়ে বিরাজ করছে এখনো।