রাতের আকাশে দিনের আলোর রহস্য উন্মোচন

বিজ্ঞান জগৎ July 6, 2017 1,185
রাতের আকাশে দিনের আলোর রহস্য উন্মোচন

ব্রাইট নাইটস বা উজ্জ্বল রাত বলতে রাতের আকাশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠাকে বোঝায়। এই আলো কোনো চাঁদের আলো নয়, তবে এই রাত্রিগুলোতে খোলা আকাশের নিচে বসেই অনায়াসে বই পড়া সম্ভব।


রাতের আকাশে দিনের মতো আলো কোথা থেকে আসে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা সেই ধাঁধার সমাধান করতে পারেনি। বহুকাল পর বিজ্ঞানীরা এই রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন।


একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ রাতারাতি তৈরি হয় না, এটা একটা ধীর গতির প্রক্রিয়া। বায়ুর উচ্চ স্তরের তরঙ্গের এক ধরনের ক্রিয়া বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই আলোর বিক্ষেপণ তৈরি হয়। কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক রাতের আকাশের এই আলোর বিক্ষেপণ কেন্দ্রিক অনেক তথ্য উপাত্তের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গের সংগৃহীত তথ্যের একটা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।


আপনি হয়তো এখনো বুঝতে পারছেন না, আমরা কোন আলোর কথা বলছি বা কোনো রাতের কথা বলছি। এই আলো কোনো জোৎস্নার বা বিদ্যুৎ চমকানো আলো নয়, রাতের আঁধারে দিনের আলোর ন্যায় সৃষ্টি হওয়া রহস্যময় আলোর কথা বলছি।


ব্রাইট নাইট অথবা আলোকোজ্জ্বল এই রাত সচরাচর দেখা যায় না। বায়ু দূষণের কারণে রাতের আকাশে আজকাল এই ধরনের আলোর বিক্ষেপণ কমে গেছে।


প্রথম শতাব্দীর দিকে দার্শনিক প্লেনি এল্ডার এ রকম একটা আলোকোজ্জ্বল রাতের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং এরপরের অন্যান্য ঘটনাগুলো- বিজ্ঞান পত্রিকা এবং সংবাদপত্রগুলো কয়েক বছর ধরে প্রতিবেদন আকারে ছাপিয়েছে।


নতুন গবেষণার প্রধান গবেষক গর্ডন শেফার্ড বলেন, ব্রাইট নাইট সম্পর্কিত ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্তগুলো এতোই স্পষ্ট এবং সুসংগত যে, শতাব্দীর প্রাচীন ব্রাইট নাইট সম্পর্কেও সহজে অনুমান করা যায়। ব্রাইট নাইট সচারচর দেখা না গেলেও এখনো এই আলোকোজ্জ্বল রাতের সন্ধান মেলে।


স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া প্রমাণাদি থেকে বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন যে, বায়ু স্তরে বায়ুর গতিবিধি ও ক্রিয়া বিক্রিয়ার ফলে আকাশের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের আলোর ছটা তৈরি হয় এবং এর পিছনে অক্সিজেন অনু এবং সূর্যের আলোরও একটি বিশেষে যোগসূত্র আছে।


শেফার্ড এবং তার সহকর্মী ইয়ংমিন গবেষণা করে ব্রাইট নাইটের কারণ ও সময়সূচি সম্পর্কে এক ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী করার উপায় বের করেছেন অর্থাৎ কখন কখন রাতের আকাশে এই ধরনের আলোর ছটা তৈরি হয় তা আবিষ্কার করেছেন। স্যাটেলাইটের তথ্যানুসারে, ব্রাইট নাইট অন্যান্য রাতের আলোর চেয়ে দশ ভাগ বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকে।


আর্জেন্টিনার অ্যাস্ট্রোনোমি অ্যান্ড স্পেস অব ফিজিক্সের জার্গেন শির বলেন, ‘এটি খুবই স্পষ্ট যে এই ধরনের আলোকোজ্জ্বল আকাশ আসলেই দেখা যায়, তবে কি কি কারণে এই অসাধারণ উজ্জ্বলতা তৈরি হয় সে উত্তরটিও সহজ অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলের বায়ুর এক ধরনের গতি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলেই এই ব্রাইট নাইটের দেখা মেলে। এটা আমরা সবাই খুব ভালো করেই বুঝি যে, এমনি এমনি এই ধরনের উজ্জ্বলতা তৈরি হয় না, কোনো এক প্রাকৃতিক কৌশলগত কারণেই এই ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি হয়।’


গবেষকদের সংগৃহীত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে জানা যায়, ঠিকঠাক পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়- এক বছরে এক জায়গায় একবারই এই ব্রাইট নাইট বা আলোকোজ্জ্বল রাতের সন্ধান মেলে। সাধারণত কালো কুচকুচে চন্দ্রহীন রাত হলেই ব্রাইট নাইটের সন্ধান পাওয়া সহজ অর্থাৎ এরকম রাতে ব্রাইট নাইটের বিশেষত্ব বোঝা সহজ হবে।


বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, প্রতি ১০০ দিনের মধ্যে ৭ দিন, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ব্রাইট নাইট সৃষ্টি হয়।


জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি গ্রুপের মতে, ব্রাইট নাইট বা আলোকোজ্জ্বল রাতের প্রভাব তাদের মহাকাশের দূরবর্তী স্থানের পর্যবেক্ষণে বাঁধা সৃষ্টি করছে।


এই গবেষণা হয়তো আপনার জীবন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে না, তবে যদি সভ্যতার কথা চিন্তা করেন তাহলে রাতের বেলার এই উজ্জ্বল আলোর একটা বিশেষ মূল্য আছে। শেফার্ড বলেন, ‘সম্ভবত ব্রাইট নাইট সম্পর্কে এটিই শেষ কথা, আমি মারা যাব তবে ব্রাইট নাইটের মৃত্যু নেই।’