পিতা-পুত্রের শীতকালীন পত্র বিনিময়

মজার সবকিছু April 18, 2016 832

পুত্রের চিঠি


শ্রদ্ধেয় আব্বাজান,


পত্রের শুরুতে সালাম নেবেন। আশা করি ভালো আছেন। এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে আপনাকে চিঠি লিখছি বলে অবাক হবেন না। আসলে চিঠির যে সারমর্ম, সেটা পৃথিবীর কোনো ছেলেই তার বাবাকে সরাসরি বলতে পারেনি। যারা বলার চেষ্টা করেছে তারা প্রত্যেকেই অপদার্থ, বেয়াদব, বদমাশ—এ রকম ঝাড়ি খেয়ে চুপসে গেছে।


পর সমাচার এই যে আব্বাজান, এখন শীতকাল, এখানে অনেক শীত। আপনি তো জানেনই ছোটবেলা থেকেই আমার আবার হাঁপানির টান। গতবার কম্বল কেনার টাকা চাওয়ার পর আপনি নিজে যে আলাদিনের গালিচার সাইজের কম্বল পাঠিয়েছিলেন, সেটি আমার জন্য বড়ই বেমানান। আমি একলা মানুষ, একলা ঘুমাই। এত বড় কম্বলের অপচয় মেনে নেওয়া যায় না। রাতের বেলা যখন কম্বল গায়ে দিই তখন শীত কিছুটা কমলেও কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। কম্বলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ অব্যবহূত থেকে যায়। দেখলে মনে হয়, ওই অংশটার নিচে অন্য কারো থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই। আব্বা, আপনি কি বুঝতে পারেন সেই হাহাকার কতটা নির্মম!


ঘরে কোনো হিটার নেই। ঘর সব সময় বরফ শীতল হয়ে থাকে। আমাদের এক বন্ধু হিটার ছাড়াও ঘর গরম রাখার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। সে শীতের আগে আগে বিয়ে করে ফেলেছে। বিয়ের পর বউয়ের মেজাজ এতই গরম থাকে যে ওদের ঘর নাকি হিটার ছাড়াই সব সময় গরম থাকে! আব্বা আপনি আবার ভেবে বসবেন না যেন আমিও বিয়ে করতে চাই। আসলে আমার আর কী এমন বয়স হয়েছে আপনিই বলুন? বন্ধুদের অনেকেই বিয়ে করেছে, ওই দিন তো এক পিচ্চি এসে মামা বলে ডাকছে। আমি কিভাবে মামা হলাম জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেন না। পিচ্চি ছিল আমাদের ক্লাসের এক বন্ধুর ছেলে! বিশ্বাসই হয় না।


আব্বা, আর বেশি কিছু বলতে চাই না। রাত হয়েছে। মশারিটাও টানানো হয়নি। নিজেকেই টানাতে হবে। আমার যে বন্ধুরা বিয়ে করেছে শুনেছি, ওদের নাকি মশারি টানাতে হয় না। কী কপাল! যাই হোক, আপনি পত্র পাওয়া মাত্র সিঙ্গেল কম্বল ও হিটার কেনা বাবদ টাকা পাঠিয়ে দেবেন। আম্মাকে আমার শ্রদ্ধা জানাবেন। কিছুদিন আগে আম্মা বলেছিলেন, তাঁর নাকি পুত্রবধূ দেখতে ইচ্ছা করছে। আম্মাকে বলবেন, দুনিয়ায় সবাই সব কিছু দেখার সৌভাগ্য নিয়ে আসে না। আম্মার কথা ভেবে খুবই খারাপ লাগছে। আপনারা ভালো থাকবেন।


ইতি


আপনার একমাত্র পুত্র


মোজাম্মেল বেপারি




পিতার চিঠি


স্নেহের মোজাম্মেল,


তোমার পত্র পাইয়াছি। এই যুগেও পত্র লিখিয়াছ দেখিয়া কিঞ্চিৎ অবাক হইলেও পত্রের ভাষার মর্মোদ্ধার করিয়া সকল কিছু পরিষ্কার বুঝিতে পারিয়াছি। শোনো বাবা, এইগুলো নিয়া একদমই চিন্তা করিবা না। যুবক বয়সে এই রকম সবারই হয়। আমারও হইয়াছিল এবং মজার ব্যাপার হইতেছে, আমিও তোমার মতো আমার পিতাকে একখানা পত্র লিখিয়াছিলাম। তারপর যাহা হইয়াছিল সেইটা আমাদের হোস্টেলে ইতিহাস হইয়া রহিয়াছে। পত্র পাঠানোর কিছুদিন পর কম্বল কিংবা হিটার না আনিয়া তোমার দাদাজান ভারী ভারী দুইখানা চ্যালা কাঠ হাতে করিয়া হোস্টেলের দরজায় হাজির হইয়াছিলেন। তারপর যাহা হইল সেইটা স্মরণ করিতে ইচ্ছা করিতেছে না। তুমি একদম চিন্তা করিয়ো না। আশা করি, তোমার রোগও দ্রুত সারিয়া যাইব। আর এই পত্র পড়িয়াও যদি হাঁপানির রোগ না সারে, তাহা হইলে উপায় না পাইয়া আমাকে হয়তো তোমার দাদার পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে। জানো বোধ হয়, ইংরেজিতে একটা কথা আছে—হিস্টরি রিপিট ইটসেলফ।


তোমার আম্মা ভালোই আছেন। তোমার পত্র পাইয়া খুশি হইয়াছেন, তবে কবে পুত্রবধূর মুখ দেখিতে চাহিয়াছিলেন এমন কোনো স্মৃতি স্মরণ করিতে পারেন নাই। তিনি তোমাকে রাত না জাগিবার জন্য আর স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখিতে বলিয়াছেন।


আজ এই পর্যন্তই।


ইতি


তোমার আব্বা


আবুল বেপারি