ভালোবাসি ‘তোকে’

লাইফ স্টাইল February 8, 2017 2,325
ভালোবাসি ‘তোকে’

ইংরেজি সাহিত্যের লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, ‘কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউবা ছুটে যায় কবিতার কাছে। আমি কিন্তু ছুটে যাই আমার প্রিয় বন্ধুটির কাছে’।


হ্যাঁ, পরিবারের পর আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হলো প্রিয় এই বন্ধু। কোনো রকম দ্বিধা কিংবা আশঙ্কা ছাড়াই যার কাছে আমরা অকপটে সব স্বীকার করি। ক্লাসে প্রথম যাকে দেখেছিলাম, সে-ই একসময় সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে গেল!


কিন্তু এখন যেন বন্ধুর প্রতি আবেগ আরও বেশি কাজ করে। এক মুহূর্তও না দেখে থাকা দায়!


যদি প্রিয় বন্ধুর প্রতি আপনার বর্তমান মানসিকতা এমন হয়ে থাকে, তবে নিজের কাছেই স্বীকার করুন যে আপনি ওই বন্ধুকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন। এমনটি কিন্তু খুব স্বাভাবিক। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ মানুষই তাই প্রিয় বন্ধুর প্রেমে পড়ে।


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মেখলা সরকার বলেন, ‘বন্ধু ভালোবাসার কথা বলতেই পারে।


কিন্তু সাড়া দেওয়া বা না বলার আগে ভেবে–চিন্তে নিতে হবে ভালো করে। যাতে ভবিষ্যতে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা নষ্ট না হয়।’ 


প্রিয় বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা

কথা হয় মনোবিদ ও অ্যাকশন ফর ডেভেলপমেন্টের কাউন্সেলর মরিয়ম সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা কখন আরেকটি মানুষকে ভালোবাসি? যখন দেখা যায় দুজনের বোঝাপড়া কিংবা মানসিকতা, পছন্দ-অপছন্দ মিলে যায়, তখনই কিন্তু দুজনে একে অপরের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি।


একটা সময় আসে যখন অপর মানুষটির প্রতি একধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে যায়। আমাদের মানব চরিত্রটাই কিন্তু এমন।’


তবে বিপত্তিটা বাধে সেখানেই, যখন দেখা যায় যে এই দুর্বলতা শুধু এক পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তখন নিজ মনের কথাটা প্রকাশ করাই একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই চ্যালেঞ্জের ফলে বিভিন্ন আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যেমন কাছের বন্ধুটি ভুল বুঝবে না তো? যদি এত দিনের বন্ধুত্বটাই ভেঙে যায়? বন্ধুটিকে ফেলে একা পথ চলতে পারব তো?


কিংবা অন্যরা জেনে গেলে কী ভাববে? হাসির পাত্রে পরিণত হব কি?


আবার মনের কথাটি না বললেও যে রয়েছে বিপত্তি। ‘আচ্ছা, আমার বদলে সে অন্য কারও হয়ে যাবে না তো?’ এমন বিভিন্ন প্রশ্ন ব্যক্তিমনে উপস্থিত হতে পারে।


তাই বলে নিজেকে নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে থাকবেন কি?

আছে সমাধান

মরিয়ম সুলতানা মনে করেন, এই ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বে আটকে থাকার কোনো কারণ নেই। কেননা এতে ক্ষতি হবে আপনার নিজেরই। তাই প্রয়োজন কিছু বিষয় মেনে চলার—



সাহস করে বলেই দেখুন


কিছু বিষয় খেয়াল রেখে মনের কথাটি স্বীকার করতেই পারেন। এ বিষয়টি ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। আপনার প্রিয় বন্ধুটিকে কাছ থেকে চেনেন শুধু আপনিই। তাই বুঝতে শিখুন যে আপনার বন্ধুটিও কি আপনার প্রতি দুর্বল। অথবা এমন একটি বিষয়ে সে বিরক্ত হবে কি না।


এমনও দেখা যায়, বন্ধুটি অন্য একটি সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আপনি তার প্রেমে পড়ে গেলেন। তাই সবচেয়ে ভালো হয়, এ বিষয়টি যদি তাকে বুঝিয়ে বলা যায়। এবং আপনার বিশ্বস্ত বন্ধুটির থেকেও প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিন, সে যাতে এই ব্যাপারটি শুধু আপনাদের মধ্যেই সীমিত রাখে।


বন্ধুর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিন


যদি ইতিবাচক সাড়া মেলে, তাহলে সমাধান তো পাওয়াই গেল। কিন্তু এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিন্তু আপনার বন্ধুর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা কোনো সম্পর্কই একপক্ষীয় হতে পারে না।


বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা


অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আগের মতো বন্ধুত্বটি আর থাকে না। নিজের অহংবোধেও (ইগো) যে ব্যাপারটি ধাক্কা দেয়। কিন্তু মরিয়ম সুলতানা বলেন, ‘আপনি তো তাকে জিজ্ঞেস করেছেন। তার উত্তরটি শুনতে চেয়েছেন। তাই বন্ধুর মনোভাব জেনেই সরে যাওয়া ঠিক নয়। হয়তো প্রিয় মানুষটির কাছে আপনি এখনো সেই আগের মতোই রয়েছেন।’


জোর না করা


প্রতিটি মানুষই একেকটি আলাদা সত্তা। প্রত্যেকেরই নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভিন্ন। তাই অপর পক্ষের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নিন। বন্ধুত্বের অজুহাত দিয়ে জোর খাটানো খুবই অনৈতিক হয়ে পড়বে।


নিজেকে বুঝুন


সবার আগে দরকার নিজেকে জানার। আপনি কি আসলেই তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন? নাকি এটি সাময়িক মোহ? কেননা ভালোবাসা এবং সাময়িক মোহর মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। এভাবে হুট করে হয়ে যাওয়া অনেক সম্পর্কই কিন্তু একটা পর্যায়ে ভেঙে পড়ে। তাই নিজেই কিছুদিন সময় নিন।


অপর পক্ষের কিছু সিদ্ধান্ত


অপর পক্ষেরও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। আপনি যদি আসলেই বন্ধুকে পছন্দ করেন, তাহলে সময় নিয়ে ভেবে দেখুন। তারপর নিজ সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দিন। আর এর বিপরীত হলে বুঝিয়ে বলুন। রেগে যাওয়া কিংবা এমন প্রশ্নের পর বন্ধুটিকে অবহেলা করার কিছু নেই। সে শুধুই আপনাকে তার ভালোবাসার কথা জানিয়েছে।


আপনিও চেষ্টা করুন বন্ধুটির সঙ্গে আগের মতোই আচরণ করার। সে যাতে আপনার কোনো ব্যবহারে নিজেকে ছোট মনে না করে।


মানসিক প্রস্তুতি


হ্যাঁ কিংবা না বলা, উভয়ের ওপরই নির্ভর করবে। তাই উভয়েরই মানসিক প্রস্তুতি রাখা দরকার। মনের কথাগুলো কীভাবে বলবেন, উত্তরটি কেমন হবে, পরবর্তীকালে বন্ধুত্ব কীভাবে টিকিয়ে রাখবেন—এই সবকিছুর জন্যই তৈরি থাকুন।


তৃতীয় পক্ষকে এড়িয়ে চলা


হ্যাঁ, কিছু সমাধানের জন্য আমরা অনেক সময়েই তৃতীয় পক্ষকে জানিয়ে থাকি। কিন্তু এর ফলে সমস্যা কিন্তু বাড়ে বৈ কমে না। তাই যতটা সম্ভব সংবেদনশীল এই বিষয়গুলো নিজেদের মধ্যেই রাখার চেষ্টা করুন।